সনাতনী জ্ঞানতীর্থ কী এবং কেনো???

সনাতন শব্দের যতো সংজ্ঞা দেওয়া হোক না কেনো, এর বড় সংজ্ঞা হলো প্রাচীন। তবে সংজ্ঞার গণ্ডি পেরিয়ে সনাতন শব্দ বুঝায় ভারতীয় উপমহাদেশে হাজার হাজার বছর ধরে  বয়ে চলা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনপ্রণালির সামষ্টিক রূপ। যা সনাতনধর্ম এবং প্রচলিত অর্থে হিন্দুধর্ম নামে পরিচিত। এ জনগোষ্ঠীর যুগোপযোগী জীবন প্রণালীর সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা প্রণালী চলতে পারেনি। তাই জীবন প্রণালীও এলোমেলো হতে দেখা যায়। আজ এ আলোচনায় চেষ্টা থাকবে কিভাবে সনাতনী জাতীয় শিক্ষা বিপর্যয় ঘটলো, উত্তরণের সম্ভাব্য উপায়। বিষয়টি কয়েকটা ধাপে আলোচনার চেষ্টা করছি :

 

(১) যে বা যিনি যে আঙ্গিকেই বলুন না কেনো, মানুষ আদিতে এমন জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেক সম্পন্ন ছিলোনা এটা ৯৯% নিশ্চিত। তাই বেশ অতীতে অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় ভারতীয়  উপমহাদেশে  বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জীবন চেতনা ধর্মচেতনায় রূপ নিয়ে জীবনের  তাগিদেই জ্ঞান চর্চা ও জ্ঞান বিনিময় শুরু হয়েছিলো।

তৎকালীন চিন্তাশীল ব্যক্তিরা জগৎ ও জীবনের মূলসূত্র খুঁজতে গিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্তর্নিহিত শক্তির অনুভাব করতে পেরেছিলেন। এনারা মৌন অবস্থায় গভীর ভাবনায় থাকার কারণে নাম পেয়েছেন মুনি এবং জ্ঞান গরিমায় শ্রেষ্ঠজন বা ঋষভ শব্দ থেকে ঋষি নামে সম্মানিত হয়েছেন। এনাদের জীবন দর্শন ও তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বেদ বলা হয়। সুতরাং বেদ বা জ্ঞানকে পারস্পরিক বিনিময়ে শুরু হয়েছিলো যে শিক্ষা তা'ই বৈদিক শিক্ষা নামে পরিচিত। মুনি-ঋষিদের অবস্থান নিরিবিলি পরিবেশে ছিলো এবং তাঁদের কুলে বা সান্নিধ্যে থেকে শুনে, দেখে, আচরণ করে শিক্ষা নিতে হতো বলে এ শিক্ষার আরেক নাম গুরুকুল শিক্ষা।

 

(২) বর্তমান জড়বিজ্ঞান ও জড়দর্শন ভিত্তিক যে জ্ঞান বিশ্বব্যাপী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তার উৎপত্তি প্রাচীন গ্রীক  সভ্যতা থেকেই এসেছে। অথচ এ গ্রীক সভ্যতা ও দর্শন বৈদিক দর্শন থেকে প্রভাবিত বলে প্রতীয়মান হয়। অথচ সনাতনীদের বৈদিক দর্শনকে অবহেলায়য় রেখে ভারতীয় উপমহাদেশে আত্মবিস্মৃত জাতীয় বোধ নিজেদের ক্ষয়িষ্ণু করে তুলেছে। বৈদিক শিক্ষা যে শুধুই পারলৌকিক আধ্যাত্ম বিদ্যা ছিলোনা তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

 

গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞান খ্রিস্টপূর্ব তিন থেকে পাঁচ শতক হতে পারে। অথচ সনাতনীদের বৈদিক যুগ পার করে পৌরাণিক যুগ সন্ধিক্ষণ মহাভারতীয় বা শ্রীকৃষ্ণের অবস্থান তিন হাজার বছর আগের। তৎকালীন রচিত মহাভারত,  কিছু আগে/পরে রামায়ণ এবং কিছুটা বিচ্ছিন্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বৈদিক জ্ঞান আহরণে সংকলিত বেদ এখনো বিশ্ব জ্ঞান চর্চায় গুরুত্ব বহন করছে।

 

(৩) গ্রীক দর্শনের পূর্ব থেকেই ভারতীয় ষড়দর্শন,  কণাদের জড়দর্শন সহ বহুমুখী জ্ঞানচর্চা সনাতনী সমাজ ব্যবস্থায় বিচরিত।  অথচ আম ফেলে বস্তা ধরে সনাতনীরা হতাশয় নিমজ্জিত। মনে করা হয় বৈদিক গুরুকুল শিক্ষা ব্যাকডেটেড, অনুন্নত। কিন্তু সেখানে বিজ্ঞান অর্থাৎ জড়জগৎ,  মহাকাশ অর্থাৎ জ্যোতিষ,  চিকিৎসা অর্থাৎ আয়ুর্বেদ,  শিল্প, সাহিত্য সব'ই আলোচিত চর্চিত ছিলো। তাহলে ব্যাকডেটেড হয় কিভাবে???

হ্যাঁ,  তখন বিমান, বুলেট বোমা ইত্যাদি আবিস্কার হয়নি। তবে এগুলোর মৌলভিত্তির সন্ধান তো বেদেই পাওয়া যায়। তবে সাধারণ জ্ঞানীর দ্বারা এগুলো উদঘাটন কঠিন বলেই এ দশা। সক্রেটিস, এরিস্টটল,  ডেমোক্রিটাস কে স্টাডি করাও সাধারণ লোকের কাজ নয়।

 

(৪) যুগ যুগ পেরিয়েছে।  গঙ্গা যমুনার অনেক জল গড়িয়েছে। অনেক অনেক ঘুর্ণিঝড় বয়ে গেছে। তবে জল গড়িয়ে স্রোত যেমন সব ভাসিয়ে নেয় তেমনি আরেক জায়গায় ভাসমান ময়লা স্থিতু হয়ে উর্বর ভূমি তৈরিও করে। সনাতনীদের সমস্যা হলো ভেঙে যাওয়া নদীতট রক্ষায় যেমন ব্যর্থতা,  উর্বর নতুন ভূমিতে নিজেদের পুন: বিস্তার ঘটাতেও অনিহা, ব্যর্থতা। যে জাতি সম্প্রসারণ নীতি পরিত্যাগ করেছে সে জাতি হয় সংরক্ষিত নয় বিলুপ্ত। এখান থেকে পুনর্জাগরণ ঘটাতে হলে শিক্ষার নিজস্ব ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনে আধুনিকতার সাথ সমন্বয় করে যুগোপযোগী দৃঢচেতা নতুন প্রজন্ম চাই। সেই কাজের মহীরুহ বটবৃক্ষের সূক্ষ্ম বীজকণা হলো "সনাতনী জ্ঞানতীর্থা"।

 

(৫) ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দায় একুশ বিঘা জমিতে " সনাতনী জ্ঞানতীর্থ" নামে আধুনিক + বৈদিক গুরুকুল শিক্ষার সমন্বয় সাধন করে একটা মানবিক শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ার প্রচেষ্টা চলছে। এটা প্রতিষ্ঠা করছে "সনাতনী ডেভলপমেন্ট ফাউন্ডেশন " নামে বাংলাদেশের একটা উন্নয়ন সংগঠন। সংগঠনটি দেশে তুলনামূলক পিছিয়ে পড়া সনাতনী সমাজ বা জনগোষ্ঠীর সার্বিক কল্যাণে কাজ করতে সচেষ্ট। আলোচনার কলেবর সীমিত করার স্বার্থে আজ শুধু জ্ঞানতীর্থ প্রকল্প নিয়ে কিছু তথ্য উপস্থাপন করছি:

ক, প্রথমেই প্রধান কার্যালয় তারাকান্দায় সনাতনধর্মীয় এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক < মাধ্যমিক< উচ্চমাধ্যমিক < এবং স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।

খ, ধাপে ধাপে সক্ষমতা ও সম্ভাব্যতা বিচারে সকল বিভাগে একটা করে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে।

গ, তৃতীয় ধাপে জেলা উপজেলায় বিস্তার ঘটানো হবে।

ঘ, মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের ন্যায় স্বতন্ত্র বোর্ড চাওয়া হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষাবোর্ড কে মডারেশন করা যেতে পারে।

ঙ, শিক্ষায় মানবিক গুণাবলি,  উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি,  সাম্য ও সততা গুরুত্ব দেওয়া হবে।

চ, সনাতনধর্মীয় আদর্শে মাথা উঁচু করে চলতে আগামী প্রজন্মকে শক্তিশালী বিশ্ব নাগরিক হিসাবে গড়া উঠতে সুযোগ করে দেওয়া হবে।

 

লেখক:

স্বপন কুমার

সমাজ চিন্তক ও সিনিয়র শিক্ষক

বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ